বর্তমানে
কোভিড-১৯ মহামারী সারা পৃথিবীকে ধরাশায়ী করে ফেলেছে। এ মুহূর্তে সংক্রমণ কমাতে
দ্রুত, কার্যকর, সহজসাধ্য ও নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থা উদ্ভাবন
অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই মারাত্মক রোগের জন্য কোনও নির্দিষ্ট
কার্যকরী ভ্যাকসিন বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ তৈরি হয়নি। তাই চিকিৎসক, বিজ্ঞানী এবং পুষ্টিবিদরা বিকল্প খুঁজছেন এবং
অনুসন্ধান করছেন, কী কী উপায়ে এই
ভাইরাল সংক্রমণ থেকে মানবদেহকে রক্ষা করা যায়।
দেহের
চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করে গড়ে
তোলে, যা সংক্রামক রোগ থেকে
রক্ষা পাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার। তার মানে, যেখানে চিকিৎসা নেই, সেখানে রোগ
প্রতিরোধব্যবস্থাটির প্রধান কাজ হলো দেহকে বিপজ্জনক অণুজীব সংক্রমণ থেকে রক্ষা
করা। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুগুলি শরীর থেকে সরিয়ে ফেলা এবং দেহের মধ্যে বেড়ে
ওঠা ম্যালিগন্যান্ট কোষের ওপর নিয়মিত নজরদারি করে এই রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা। কারণ
এগুলো দেহের স্বাভাবিক কাজে ব্যঘাত ঘটাতে
পারে। তাই পুষ্টিকর খাবারের অভাব শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দিতে
পারে।
কোভিড-১৯ রোগীর
সাম্প্রতিক কেসগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সমস্যা (এআরডিএস) মৃত্যুর
মূল কারণ। অন্যদিকে অন্তঃকোষীয় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন এবং
নাইট্রোজেন) হলো এআরডিএসের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটা কোষকে ধ্বংস করে
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যঘাত ঘটায়। ফলে রোগি ধীরে ধীরে মৃত্যুর
দিকে এগিয়ে যায়। চীনের টংজি মেডিকেল কলেজের একদল গবেষক কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ২৯ জন
রোগীর উপর একটি ছোট গবেষণা চালান। তাঁরা দেখেন, ২৭ জন
রোগীরই সিআরপি প্রোটিন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রোটিন প্রদাহ এবং
অক্সিডেটিভ স্ট্রেসকে ত্বরান্বিত করে।
যেহেতু কার্যকরী
ভ্যাকসিন এবং অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রস্তুতের জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন, উপরে উল্লিখিত প্রস্তাবিত ডোজে ভিটামিন সি এবং
ডি এর ব্যবহার কোভিড-১৯ এর ফলে যে এআরডিএস হয় তা হ্রাস করা এবং রোগ প্রতিরোধক
ক্ষমতা বাড়াতেকার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
ভিটামিন সি
ভিটামিন সি ওয়াটার সলিউব্ল । এটা শরীরের সহজাত এবং অভিযোজক (adaptive) বিভিন্ন কোষীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে দেহের রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে। ভিটামিন সি ক্ষতিকর জীবাণুগুলির বিরুদ্ধে
এপিথিলিয়াল প্রতিরোধব্যবস্থাকে দৃঢ় করে। এ ছাড়া ত্বকে যে অক্সিড্যান্ট
স্ক্যাভেনজিং প্রক্রিয়া আছে, তাকেও সাহায্য
করে ভিটামিন সি। এর ফলে সম্ভাব্য জারণ প্রক্রিয়ার চাপ থেকে কোষ কিংবা টিস্যু রক্ষা
পায়। ভিটামিন সি ফাগোসাইটিক কোষগুলিতে জমে থাকা নিউট্রোফিলস এবং কেমোট্যাক্সিস,
ফাগোসাইটোসিস, প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতির উৎপাদন
বাড়াতে সাহায্য করে। এমনকি অণুজীবের ধ্বংস হারও বাড়িয়ে দেয়। ম্যাক্রোফেজ দ্বারা
সংক্রমণের স্থানগুলি থেকে অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত কোষ এবং ব্যবহৃত
নিউট্রোফিলগুলিকে সরিয়ে ফেলে। ফলে নেক্রোসিস/NETosis এবং সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পরিমাণ কমে
যায়।
সম্প্রতি
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল -এ একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
এআরডিএস-এ আক্রান্ত ১৬৭ জন রোগীর ওপর করা এক গবেষণার বিশ্লেষণ করা হয়েছে সেই
প্রবন্ধে। ওই গবেষণায় রেগিদের দিনপ্রতি ১৫ গ্রাম ইন্ট্রাভেনাস (আইভ) ভিটামিন সি
দেওয়া হয়েছে পর পর চারদিন। ফলে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোভিড-১৯
আক্রান্ত চীনের ৫০ জন রোগীর ওপর করা আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই
গবেষণায় দেখা গেছে, একটি উচ্চমাত্রা
(ডোজ) আইভি ভিটামিন সি সফলভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে অক্সিজেনেশনের হার। সকল রোগী শেষ
পর্যন্ত সুস্থ হয়েছে।
কোরিয়ান আর্মি
ট্রেনিং সেন্টারে ১৪৪৪ জন ব্যক্তিকে নিয়ে করা হয়েছে আরেকটি গবেষণা। তাতে দেখা গেছে,
ওরাল ভিটামিন সি (৬
গ্রাম/প্রতিদিন) ভাইরাল সংক্রমণের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে সক্ষম। এই গবেষণার রিপোর্ট গত
মার্চে বিএমজে মিলিটারি হেলথ জার্নাল-এ প্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি বেশ কয়েক দশক ধরে
চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হচ্ছ। সাম্প্রতিক এনআইএইচ বিশেষজ্ঞ প্যানেলের রিপোর্ট
পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, উচ্চমাত্রার
ভিটামিন সি (দেহের প্রতিকেজি ওজনের জন্য ১.৫ গ্রাম) মানব দেহের জন্য নিরাপদ ।
এখন দেখা যাক,
কীভাবে ভিটামিন সি
কোভিড-১৯ কারণে তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার সমাধানে আণবিক লেভেলে কাজ করে।
ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, কোলাজেন সিন্থেসিস এবং জিন নিয়ন্ত্রক মনো
অক্সিজেনেস ও ডাই-অক্সিজেনেস এনজাইমগুলির কোফ্যাক্টর অর্থাৎ সহযোগী হিসেবে কাজ
করে। এটা ফুসফুসের এয়ার স্যাকের এপিথিলিয়াল প্রতিরক্ষাব্যবস্থাপনার
রক্ষণাবেক্ষণেও সহায়তা করে। এছাড়া সিএফটিআর, একোয়াপুরিন-৫, ENaC, এবং Na+/K+ ATPase মতো প্রোটিন চ্যানেলগুলিকে বৃদ্ধি করে। ফলে
অ্যালভিওলার তরল নিঃসরণ কমে যায় । এছাড়াও ফাগোসাইটিক কোষগুলিতে জমে থাকা ভিটামিন
সি, কেমোট্যাক্সিস, ফাগোসাইটোসিস এবং শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন
ক্ষতিকারক অণুজীব ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে।
ভিটামিন ডি একটি
চর্বিতে দ্রবনীয় ভিটামিন যা শরীরের ক্যালসিয়াম, ফসফেট ইত্যাদির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
ভিটামিন ডি অস্থির কাঠামো তৈরি এবং ঘনত্ব বৃদ্ধিতে প্রভূত ভূমিকা রাখে। নাম শুনে
ভিটামিন মনে হলেও ভিটামিন ডি আসলে একটি স্টেরোয়েড হরমোন। অন্যান্য ভিটামিন যেখানে
এন্টি অক্সিডেন্ট বা কো-এনজাইম হিসাবে কাজ করে, ভিটামিন ডি (স্টেরোয়েড হরমোন) জিন এক্সপ্রেশন
নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ দেহের প্রোটিন তৈরিতে নিয়ন্ত্রণকারীর ভ‚মিকায় থাকে। প্রাণীজ ও উদ্ভিদজাত স্টেরল ও
ফাইটোস্টেরল হতে সূর্যালোকের অতি বেগুনী রশ্মি দ্বারা রূপান্তরিত হয়ে দেহে ভিটামিন
ডি তৈরি হয়। ভিটামিন ডি-২ ও ভিটামিন ডি-৩ মানব দেহে থাকে।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ভিটামিন ডি-র ভুমিকাঃ
যুক্তরাজ্য
ভিত্তিক একটি গবেষণায় করোনা ভাইরাসের হাত থেকে রেহাই পেতে প্রতিদিন সুষম ও
পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহন করার কথা বলেছেন। ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি-সহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে,
এমন খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত
করতে বলেছেন। এর সুত্র ধরে, ডায়াবেটিস রোগীতো
বটেই, অন্যদেরকেও এ কোভিড ১৯
মহামারীকালে অন্যান্য উপকারী খাদ্য উপাদান গ্রহণে উদ্যোগী হবার সাথে সাথে ভিটামিন
ডি সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের দিকে নজর দিতে হবে (ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাদ্য উপাদানের
তালিকা যুক্ত করা হলো)। কিন্তু আমাদের দেশে প্রচুর সূর্যালোক থাকার পরও অধিকাংশ
মানুষ ভিটামিন ডি-র ঘাটতিতে ভুগছেন এবং তাদের ভিটামিন ক্যাপ্সুল সেবেনের পরামর্শ
দিতে হচ্ছে।
ভিটামিন ডি-র উৎস
উৎস সূর্যরশ্মি পরিমাণ শরীরের ভিটামিন ডি-র চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি ত্বকে সূর্যরশ্মি পতিত হওয়ার কারণে তৈরি হয়।
খাদ্য উপাদান
স্যালমন ফিশ তাজা (সামুদ্রিক) পরিমাণ ৩.৫ আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট)
৬০০-১০০০
তাজা (চাষের)
পরিমাণ ৩.৫ আউন্স আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট) ১০০-২৫০
সার্ডিন
(কৌটাজাত) পরিমাণ ৩.৫ আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট) ৩০০
টুনা (কৌটাজাত)
পরিমাণ ৩.৫ আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট) ২৩৬
ম্যাকারেল
(কৌটাজাত) পরিমাণ ৩.৫ আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট) ২৫০
মাশরুম (তাজা)
পরিমাণ ৩.৫ আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট)১০০
কৌটাজাত পরিমাণ
৩.৫ আউন্স আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট) ১৬০০
ডিম (সিদ্ধ)
পরিমাণ ৩.৫ আউন্স ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট) ২০
টক দই পরিমাণ ১৭৫
গ্রাম ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি (ওট) ৫৮-৭১
৪০ (ওট) ভিটামিন
ডি-র কার্যকারিতা ১ মাইক্রোগ্রাম সমতুল্য।
সূর্যালোক থেকে
ভিটামিন ডি পেতে হলে মার্চ থেকে অক্টোবর মাসের (অন্যান্য মাসগুলোতে আরো বেশি সময়
ধরে) প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট রোদ পোহাতে হবে যখন শরীরের ১৮ শতাংশের বেশি অংশে
রোদ লাগবে।
১-৭০ বছর বয়সি
মানুষের গড়ে প্রতিদিন ৬০০ ওট এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সিদের ৮০০ ওট ভিটামিন ডি গ্রহণ
করা দরকার।
দূর্ভাগ্যবশত: আমাদের দেশে প্রচলিত খাদ্যসমূহে ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি খুবই কম, তারপরও যেসব খাদ্যে ভিটামিন ডি-র কিছু পরিমাণে
উপস্থিতি আছে (উপরের তালিকা ভুক্ত) তা যতটা সম্ভব নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট / ওষুধ
হিসাবে কাদের খেতে হবে কাদের ?
১। নবজাতক যারা
শুধুই মায়ের দুগ্ধ পান করছে ও যারা ১০০০ মিলিলিটারের কম শিশু খাদ্য গ্রহণ করে।
২। শিশু-কিশোর
যারা অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠা নগরে বা অস্বাস্থ্যকর শহরে (কলকাতা অন্যতম) বসবাস
করছে।
৩। দৈহিক স্থুল শিশু-কিশোর যাদের স্কিনের বিভিন্ন অংশে
মকমলের মতো কালো অংশ দেখা দিচ্ছে।
৪। ধর্মীয় বা
অন্য কারণে পোশাকে প্রায় সারাদেহ আবৃত শিশু-কিশোর।
৫। খাদ্য নালীর
সমস্যার কারণে হজম ও বিপাকীয় কার্যক্রম হ্রাস পেলে।
৬। প্রাতিষ্ঠানিক
জীবন যাপন (হেস্টেল, হাসপাতাল বা
অফিস) যাতে রোদে যাবার সুযোগ কমে যায়।
৭। এবং রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়েছে, এমন হলে।


0 Comments